জমি বিরোধকে কেন্দ্র করে আজিজের পরিবারকে মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করছে ‘নেজাম সিন্ডিকেট’

কক্সবাজার সদরের খুরুশকুলে জমিসংক্রান্ত বিরোধের জেরে একটি অসহায় পরিবারকে চাঁদাবাজি, চুরি-ডাকাতিসহ মারধরের মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করার অভিযোগ উঠেছে নেজাম উদ্দিনের বিরুদ্ধে। ঘটনাটি ঘটেছে খুরুশকুল ইউনিয়নের রাস্তারপাড়া গ্রামে।

এসব অভিযোগ এনে রোববার (২৪ মার্চ) বিকেলে এক সংবাদ সম্মেলন করেছেন ভুক্তভোগী আজিজুল হকের পরিবার।

সংবাদ সম্মেলনে পরিবারটি দাবি করেন, একের পর এক ১০টির বেশি অভিযোগ আর দুইটি মামলা দিয়ে নির্যাতন ও হয়ারানি করেছেন খুরুশকুলের নেজাম সিন্ডিকেটে। এতে আজিজুল হকের পরিবার একেবারেই নিঃস্ব হয়ে পথে বসার উপক্রম হয়েছে। শুধু তাই নয়, আজিজের বোনদের বিয়ে দিতেও প্রতিবন্ধকতা করেছেন। নেজাম উদ্দিনের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ দুইটি মিথ্যা মামলায় দুইবার জেল খেটেছেন আজিজুল হক ও তার পরিবারের সদস্যরা। এমনকি ক্ষেতে স্কিমের পানি বন্ধ করে দিয়ে চাষাবাদের ফসল নষ্ট করা হয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে আজিজুল হক ছাড়াও তার মা জাহানারা বেগম, চাচা নুরুল হক, ফুফু মনজুরা বেগম, ফুফাতো বোন জয়নাবা বেগম ও ছোট ভাই সাইফুল ইসলাম সাহেদও উপস্থিত ছিলেন। সংবাদ সম্মেলনে ওই সিন্ডিকেটকে নানাভাবে সহযোগিতার অভিযোগ তোলা হয় কক্সবাজার সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে। এ ঘটনার প্রতিকার চোয়ে পুলিশের হেডকোয়ার্টারেও অভিযোগ করার কথা জানিয়েছেন আজিজুল হক।

সংবাদ সম্মেলনে আজিজুল হক বলেন, খুরুশকুল ইউনিয়নের ৩নং ওয়ার্ডের রাস্তার পাড়ায় আমার পৈত্রিক বসতবাড়ি ও চাষাবাদকৃত জমি নিয়ে ২০০৮ সাল থেকে বিরোধ করে আসছে সাকের আলম বহদ্দার ও তার ছেলে নেজাম উদ্দিন। তাদের বছরের পর বছর ধরে নানা হয়রানি ও নিপীড়ন থেকে রেহাই পেতে আমার বাবা শফিউর রহমান ২০১৪ সালে কক্সবাজার সিনিয়র জজ আদালতে একটি বিএস সংশোধনী মামলা করেন। যার নম্বর-২১৬, অপর ১০৯৬। ওই মামলা করায় আমার পরিবারের ওপর নেমে আসে নির্যাতন নিপীড়নের স্টিমরোলার। সাকের আলম বহদ্দার ও তার ছেলে নেজাম উদ্দিন এরপর থেকে খুরুশকুল ইউনিয়ন পরিষদ এলাকায় সামাজিক বিচারের নামে আমার বাবাকে চরম নাজেহাল ও হয়রানি করে। কিন্তু আমার বাবা তখন কোনো বিচার কিংবা সমাধান পাননি। পিতাপুত্রের সিন্ডিকেট বারবার মোটা অংকের টাকা আর তাদের ট্রলারের মাছের ‘উৎকোচে’র কাছে আমাদের পরিবার হেরে গেছে। অসহায় ও গরীব ঘরের লেখাপড়া না জানা আমার বাবাকে প্রকাশ্যে ও দিবালোকে হত্যার হুমকি দিয়েছিলো এই সাকের আলম বহদ্দার ও নেজাম উদ্দিন। এক পর্যায়ে আমার বাবা তাদের নানা ধরণের নির্যাতনের শিকার হয়ে ২০১৯ সালে মৃত্যবরণ করেন।

আজিজুল হকের মতে, বাবার মৃত্যুর পর সাকের আলম বহদ্দার ও তার ছেলে নেজাম উদ্দিন আমার বাবার অংশীদার সূত্রে আরএস ১১৭৭/১১৭৬/১৮৯২ খতিয়ানের তুলনামূলক বিএস ১১২৩/১১২৪/১৭৭৩ খতিয়ানের জমিতে তাদের দখল দাবি করে আমাকে হয়রানি করা শুরু করে। বাবার মৃত্যুর পরই ২০১৯ সালে আমার বিরুদ্ধে কক্সবাজার সদর মডেল থানায় মিথ্যা হয়রানি মূলক অভিযোগ দেয় সাকের আলম বহদ্দার। ওই সময় সদর মডেল থানার এসআই, ওসিদের টাকা দিয়ে আমাকে হয়রানি করে। এসআই আনসার আলী, ইন্সপেক্টর ইয়াছিন, এসআই লিয়াকত, এসআই আতিক, এসআই আমজাদসহ একাধিক পুলিশ কর্মকর্তাদের দিয়ে আমাকে হয়রানি করেছে তারা। তবে এসআই আমজাদ নামের একজন পুলিশ কর্মকর্তা নিরপেক্ষতা দেখিয়ে ৩ জন এডভোকেট নিয়ে এই পিতা-পুত্রের হয়রানির বিচারের আয়োজন করেছিলেন। ওই সময় কক্সবাজার সিনিয়র এডভোকেট আইন কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ মুহাম্মদ বাকের দীর্ঘ তালাশ, সন্ধান, বিবেচনা করে ২টি আইনগত মতামত দেন। যেখানে আমাদের পরিবারের পক্ষেই মতামত দিয়েছেন তিনি। দীর্ঘ ৩১ পৃষ্ঠার আইনগত মতামত, চূড়ান্ত শালিস না মেনে উল্টো আমার ওপর ক্ষুদ্ধ হয়ে সাকের আলম বহদ্দারের ছেলে নেজাম উদ্দিন কক্সবাজার শহরের বিভিন্ন সন্ত্রাসি, প্রভাবশালী লোকদের ভাড়া করেন। রাতের আঁধারে নেজাম উদ্দিনের খালাতো ভাই মিজানুর রহমান ও পাহাড়তলী এলাকার মোহাম্মদ হাসানকে দিয়ে আমাকে বিভিন্ন সময় হত্যার হুমকি দিতে থাকে। এক পর্যায়ে কক্সবাজার শহরের এক প্রভাবশালী দিয়ে আমাকে দমানোর জন্য ওই প্রভাবশালীর স্ত্রীকে ৭ শতক জমি উপহার দেয় সাকের আলম বহদ্দারের ছেলে নেজাম উদ্দিন।

আজিজুল হক কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ওই সিন্ডিকেটের হয়রানির শিকার হয়ে আমরা ৪ ভাই ও ৩ বোনের সংসার চালাতে এখন রীতিমত হিমশিম খাচ্ছি। বাবার মৃত্যুর পর আমার বোনদের বিয়ে দিতেও এই সিন্ডিকেট বাধা দিয়ে আসছে। আমাদের পুরনো ছনের ছাউনি, বাঁশের বেড়ার ঘর ভেঙ্গে যাওয়ায় বোনদের বিয়ে দিতে ইট দিয়ে একটি রুম নির্মাণ করার চেষ্টা করেছিলাম। ওটা করতে গেলে ২০২২ সালের ২৪ আগষ্ট কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষকে মিথ্যা ও ভুল তথ্য দিয়ে আমাকে হয়রানি করে তারা। এই ঘটনার দুইদিন পর ২৬ আগষ্ট সাকের আলম বহদ্দারকে (নেজাম উদ্দিনের পিতা) মারধর, চাঁদাবাজি, অপহরণ, হত্যার হুমকি এবং আমাকে তাদের বাড়ির ‘কেয়ারটেকার’ বলে একটি নাটক সাজিয়ে কক্সবাজার সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিষ্ট্রেট আদালতে নেজাম উদ্দিন বাদী হয়ে নালিশী মামলা দায়ের করে।

আদালতের এই মামলা কক্সবাজার সদর থানায় তদন্ত দিলে নিরপেক্ষভাবে ব্যাপক অনুসন্ধান ও তদন্ত করে ‘এই ধরণের কোনো ঘটনার পর্যাপ্ত কোনো সাক্ষ্য-প্রমাণ পায়নি’ মর্মে ২০২৩ সালের ২৬ জুলাই সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিষ্ট্রেট আমলী আদালতে তদন্ত রিপোর্ট দাখিল করেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা কক্সবাজার সদর মডেল থানার সাব-ইন্সপেক্টর মো. ইলহাম উল হক। এই সাজানো ঘটনাতে নিজেরা মিথ্যা প্রমাণ হওয়ায় পিতা-পুত্রের সিন্ডিকেট আবারও নতুন ফন্দি আঁটতে শুরু করে। আমাকে ও আমার পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে পুলিশকে ব্যবহার করে নানা ধরণের অভিযোগ দায়ের করতে থাকে। তারই অংশ হিসেবে গত ২০২৩ সালের ২৩ ডিসেম্বর খুরুশকুলের রাখাইন পাড়ায় আমার ভোগদখলীয় জমি, যাতে আদালতের নিষেধাজ্ঞাও রয়েছে, সেই জমি বেআইনি ভাবে দখল নিতে দলবল নিয়ে যায় এবং আমাকে উপর্যুপুরি মারধর করে নেজাম উদ্দিন, জাহাঙ্গীর আলম ও আনছার আলী। এই ঘটনায় একইদিন আমি কক্সবাজার সদর হাসপাতালে চিকিৎসা গ্রহণ করে কক্সবাজার সদর মডেল থানায় নেজাম উদ্দিনকে আসামি করে একটি এজাহার দায়ের করি। কিন্তু কক্সবাজার সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রকিবুজ্জামানের সাথে নেজাম উদ্দিনের ঘনিষ্ঠতা থাকায় আমার এজাহার না নিয়ে ২৭ ডিসেম্বর আরেকটি মিথ্যা অভিযোগ দিয়ে উল্টো আমার বিরুদ্ধে এবং ৬ মাস আগে থেকে লিবিয়ায় প্রবাসে থাকা ছোট ভাই সাকের উল্লাহ প্রকাশ আশেকুর রহমানসহ আমাদের ৬৫ বছরের বৃদ্ধ চাচা নুরুল হককে আসামি করে একটি চুরি ও ডাকাতির মামলা দায়ের করায় জাহাঙ্গীর আলম নামের এক সহযোগীকে বাদী করে।

লিখিত বক্তব্যে আজিজুল হক অভিযোগ তুলেন, তিনি যখন পহেলা জানুয়ারি থেকে পিতা-পুত্রের সিন্ডিকেটের একটি মিথ্যা মামলায় কারাভোগ করছিলেন, তখনও তাদের ষড়যন্ত্র বন্ধ ছিল না। ২০২২ সালে নেজাম উদ্দিনের পিতা সাকের আলম বহদ্দারকে মারধর, চাঁদাবাজি, অপহরণের মিথ্যা অভিযোগে তারা যে মামলা করেছিলো, সেই মামলায় পুলিশ কোনো ধরণের ঘটনার অস্তিত্ব না পেলেও পুলিশের সেই প্রতিবেদনে আদালতে নারাজি দিয়ে কক্সবাজার সদর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) রকিবুজ্জামানের সহযোগিতায় আবার পুলিশ পরিদর্শক দুর্জয় বিশ্বাসের মাধ্যমে আরেকটি মিথ্যা তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে জমা দেয় পুলিশ। চলতি বছরের ৪ জানুয়ারি পুলিশের নতুন ওই তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে জমা দেওয়া হয়। আশ্চর্যের বিষয় হলো- পুলিশ পরিদর্শক দূর্জয় বিশ্বাসের জমা দেওয়া তদন্ত প্রতিবেদনে যে স্বাক্ষীদের নাম দেওয়া হয়েছে, সেই তিনজন স্বাক্ষীই কিছু জানেন না বলে আমাকে নিশ্চিত করেছেন। তারা পরবর্তী ধার্য তারিখে আদালতে বিষয়টি তুলে ধরবেন বলেও অঙ্গীকার করেছেন। তার অভিযোগ, তদন্তকারী কর্মকর্তা আমার বিরুদ্ধে দেওয়া তদন্ত প্রতিবেদনে ‘নিরপেক্ষ স্বাক্ষী’ হিসেবে যার নাম দিয়েছেন, সেই পাহাড়তলীর বাদশা মুন্সির ঘোনার মোহাম্মদ হাসান, পিতা- নূর মোহাম্মদ। যিনি আমাকে দীর্ঘদিন ধরে হত্যার হুমকি দিয়ে আসছে।

তার দাবি, ২০২৩ সালের ২৩ ডিসেম্বর আমাকে হত্যার উদ্দশ্যে মারধর করার ঘটনায় দায়ের করা মামলা দায়ের করার চেষ্টা করলেও তা রেকর্ড করেননি সদর মডেল থানার ওসি রকিবুজ্জামান। আজিজুল হক ও তার পরিবার হয়রানি থেকে মুক্তি পেতে প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পুলিশের আইজি ও মানবাধিকার সংস্থার প্রতি আকুল আবেদন জানিয়েছেন। তারা বিষয়টির বিচার বিভাগীয় তদন্তেরও দাবি করেছেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে অভিযুক্ত নেজাম উদ্দিন বলেন, আজিজুল হক পেশিশক্তির জোরে আমাদের অনেক জমি দখলে রেখে দিয়েছে। এইসব জমি উদ্ধার করতে গেলে আমার বৃদ্ধ বাবার ওপর হামলা চালায়। এই ঘটনায় চাঁদাবাজি ও অপহণের অভিযোগে একটি মামলা করেছি।

এ বিষয়ে কক্সবাজার সদর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) রকিবুজ্জামান বলেন, আমি আজিজুল হককে চিনিনা-জানিনা। তাকে মামলা দিয়ে হয়রানি করার প্রশ্নই উঠেনা।

Leave A Reply

Your email address will not be published.